ছবি: ফাইল ছবি
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অধিক আলোচিত একটি অর্থনৈতিক সূচক হিসেবে উঠে এসেছে, যা দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিষেবা সক্ষমতা, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং বৈদেশিক লেনদেনে আস্থা সৃষ্টি—এই চারটি মূল ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ধীরে ধীরে ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে আসার পর অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, এবং বিশেষজ্ঞ মহলে ধারণা ছিল যে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও ঋণের ওপর নির্ভরতা ছাড়া রিজার্ভ আবার শক্তিশালী হওয়া কঠিন হবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণের ছাড়াই রিজার্ভ পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন ও আর্থিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। বর্তমান রিজার্ভ প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ঘরে এবং নিকট ভবিষ্যতে ৩৫ বিলিয়ন ডলার স্পর্শ করার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, যা বিনিয়োগকারী ও আর্থিক খাতের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে আস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রিজার্ভ বৃদ্ধি ও মুদ্রাবাজারে স্থিরতা আনার কাজে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে লিকুইডিটি ম্যানেজমেন্ট, মানি মার্কেটের সুদের হার সমন্বয়, ডলার রেট স্থিতিকরণ, এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণে নীতির দক্ষ প্রয়োগ। জানুয়ারির প্রথম ১৮ দিনে রেমিট্যান্সে ৬৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রবাসী আয়ের পুনরুত্থানের সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত দেয়। একই সময়ে আমানত প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ হওয়ায় ব্যাংকিং খাত আবারও তার স্বাভাবিক গতির দিকে ফিরছে। অন্যদিকে ফোরেক্স মার্কেটে চাপ কমাতে আমদানি বিল পরিশোধে শৃঙ্খলা আনা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, এবং বাণিজ্যে কাঠামোগত সমন্বয় কার্যকর হয়েছে বলে আর্থিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। তবে রিজার্ভ বৃদ্ধির সাফল্যের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে, যেখানে দেশীয় বাজারে পণ্যমূল্য এখনও চাপের মধ্যে এবং মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা আগের তুলনায় দুর্বল। এ অবস্থায় মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল করা এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেটের আস্থা ফিরিয়ে আনা সরকারের অগ্রাধিকারভুক্ত লক্ষ্য। অর্থনীতির বাস্তব সময়ের চিত্র বুঝতে পিএমআই সূচকের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বেসরকারি খাতের উৎপাদন, ব্যবসা প্রবণতা, চাহিদা, অর্ডার ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতির গতিধারা নির্দেশ করে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সংস্থার কাছে এটি দেশের সক্ষমতা ও প্রবৃদ্ধি সম্ভাব্যতার একটি স্বচ্ছ সিগন্যাল হিসেবে কাজ করছে, যা ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রসারে ভূমিকা রাখতে পারে। বাণিজ্যিক পরিমণ্ডলে বিশেষত পোশাকশিল্পে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ায় রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও রিজার্ভ শক্তিশালী হতে শুরু করেছে, তা বজায় রাখতে অর্থনৈতিক নীতি সমন্বয়, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, আমদানি রেশনালাইজেশন, ডলার মার্কেটের শৃঙ্খলা, এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখাকে অর্থনীতিবিদরা জরুরি মনে করছেন। ভারত, চীন, ভিয়েতনামসহ আঞ্চলিক দেশের প্রবৃদ্ধির অভিজ্ঞতা বলে যে রিজার্ভ বৃদ্ধি শুধু টাকার হিসাব নয়; বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দীর্ঘমেয়াদি ইকোসিস্টেম নির্মাণের প্রতিফলন। তাই ঋণের অর্থ ছাড়াই রিজার্ভ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা দেশীয় অর্থনীতির সক্ষমতা, নীতি প্রয়োগের বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ আস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও বিশ্ববাণিজ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধিতে নতুন দিগন্ত খুলতে পারে।
repoter

