ছবি: ফাইল ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির মনোনয়ন ব্যবস্থাপনা ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মধ্যে আসন সমঝোতার প্রক্রিয়ায় একটি উল্লেখযোগ্য জটিলতা তৈরি হয়েছে, কারণ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত ৭৯টি আসনে দলের ৯২ জন নেতা বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে থেকে গেছেন, যা দলীয় শৃঙ্খলা, নির্বাচন কৌশল এবং রাজনৈতিক জোটবদ্ধতার সমীকরণকে প্রভাবিত করছে বলে বিশ্লেষকদের মন্তব্য। শুরুতে প্রায় ১১৭ আসনে ১৯০ জনের বেশি নেতা দলীয় প্রক্রিয়ার বাইরে প্রার্থী হয়েছিলেন, যাদের মাঝে অনেকে বাছাইপর্বে বাতিল হয়েছেন বা শেষ মুহূর্তে সরেছেন, তবে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যক প্রার্থী বহিষ্কার, সতর্কতা ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনের মাঠে অবস্থান ধরে রেখেছেন। বিদ্রোহীদের উপস্থিতি কেবল মাত্র ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ক্ষোভ, জোট রাজনীতির চাপ ও স্বার্থসংঘাত এবং মাঠ পর্যায়ে দলের মধ্যে নেতৃত্বসংকটের ইঙ্গিতও বহন করে বলে অভিমত উঠে এসেছে। এদের মধ্যে অন্তত ১০ জনকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, কিন্তু তাতেও অধিকাংশ মাঠ ছাড়েননি। বিদ্রোহী সংকট শুধু বিএনপির অভ্যন্তরে নয়, জোট রাজনীতিতেও চাপ তৈরি করেছে, কারণ দল বিভিন্ন আসন ছেড়ে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সমর্থন দেওয়ার যে কৌশল নিয়েছিল, সেখানে বিদ্রোহীরা সরেননি বলে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়েছে। রাজধানী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন আসনে বিদ্রোহীরা অবস্থান ধরে রেখেছেন, ফলে প্রার্থী প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত একাধিক আসনে একই দলের প্রতীকমুক্ত কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়-সংযুক্ত লড়াই তৈরি হয়েছে। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের আসনেও দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থিতা দেখা গেছে, যেমন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার ক্ষেত্রে দুই আসনে প্রার্থিতা বহাল রাখা, যা বিএনপির সমর্থন কৌশলকে চাপে ফেলে দিয়েছে। মনোনয়ন গণনা অনুযায়ী, দু-একটি আসন বাদে অধিকাংশ বিদ্রোহী জেলাভিত্তিক শক্তি, দলীয় নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সমর্থনে মাঠে রয়েছেন, যা নির্বাচনী লড়াইকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নও সামনে এসেছে, কারণ বিদ্রোহের কারণে দল ও জোটের কৌশলগত সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে নির্বাচনী গণিতও জটিল হচ্ছে, কারণ বিদ্রোহীরা শরিকদের পাশাপাশি বিএনপির অফিসিয়াল প্রার্থীদেরও বিভক্ত ভোটের চাপ দিচ্ছেন, যা সম্ভাব্য ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। মনোনয়ন, প্রত্যাহার, বাছাই ও জোটসংক্রান্ত এই জটিল প্রক্রিয়ায় ভোটারদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে—কোনটি জোটের প্রকৃত প্রার্থী, কার প্রতীক এবং কোন নেতৃত্ব কাকে সমর্থন করছে তা অনেক ক্ষেত্রে পরিষ্কার নয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এবার ৩০০ আসনে ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে, যার মধ্যে বিভিন্ন ধাপে বাতিল ও প্রত্যাহারের পর এখন চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। এসব সমীকরণে বিএনপির সামনে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ আসছে: প্রথমত, দলীয় পরিচয় বজায় রেখে শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন; দ্বিতীয়ত, শরিকদের সাথে সমন্বয় ধরে রাখা; তৃতীয়ত, নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ব্যবস্থাপনা; এবং চতুর্থত, বিদ্রোহের কারণে আভ্যন্তরীণ অসন্তোষ প্রশমিত করা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্রোহের ক্রমবৃদ্ধি ও দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো, মাঠ পর্যায়ের ক্ষমতাবিভাজন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রণনীতি পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
repoter