ছবি: বাংলার বার্তার নিজস্ব ক্যামেরায় ধারণকৃত
রাজধানী ঢাকায় যেসব সড়কে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ, সেখানে রিকশার প্রবেশ ঠেকাতে নেওয়া উদ্যোগ কার্যত ভেস্তে গেছে। প্রধান সড়কে রিকশা ওঠা বন্ধ করতে প্রবেশমুখে বিশেষ ধরনের ‘ট্র্যাপার’ বা ফাঁদ বসানো হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও চালকদের প্রতিরোধে তা অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে এখন আবারও ঢাকার মূল সড়কগুলোতে অবাধে চলাচল করছে রিকশা।
২০২৪ সালের মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর বেইলী রোড ও ব্যাটারি গলিতে এই ট্র্যাপার বসানো হয়। পরে ধাপে ধাপে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন যেসব সড়কে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ, সেসব প্রবেশমুখে এ ধরনের ফাঁদ স্থাপন করা হয়। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে Dhaka South City Corporation এবং Dhaka Metropolitan Police-এর ট্রাফিক বিভাগ।
ট্র্যাপারগুলোর নকশা ছিল এমন যে, কোনো রিকশা সেটির ওপর দিয়ে যেতে চাইলে লোহার খাঁজে চাকা আটকে যাবে। কিছু ট্র্যাপারে এমন ব্যবস্থাও ছিল যাতে চাকা আটকে যাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উদ্দেশ্য ছিল—ফিডার রোড থেকে মূল সড়কে রিকশা ওঠা পুরোপুরি বন্ধ করা, যাতে ট্রাফিক পুলিশের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা যায়।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ট্র্যাপারগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করায় সেগুলো দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লোহার অংশে মাটি জমে যায়, অনেক জায়গায় জং ধরে ভেঙে যেতে থাকে। কোথাও কোথাও রিকশাচালকেরা ইচ্ছাকৃতভাবে পিটিয়ে ট্র্যাপার সমান করে ফেলেন, আবার কোথাও সিমেন্ট ঢেলে ফাঁদ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি কিছু স্থানে ট্র্যাপার সরিয়েও ফেলা হয়েছে।
শুধু রিকশাই নয়, এসব ট্র্যাপার স্থাপনের ফলে অনেক সময় প্রাইভেটকারের চাকা স্লিপ করত এবং গাড়ি উঠতে সমস্যায় পড়ত বলে অভিযোগ ছিল। এতে সাধারণ গাড়িচালকদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়।
এ ধরনের উদ্যোগ এর আগেও নেওয়া হয়েছিল। ২০১৪ সালের মে মাসে রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ‘প্রতিরোধ’ নামে একটি ডিভাইস পরীক্ষামূলকভাবে বসানো হয়, যা উল্টো দিক দিয়ে প্রবেশ করা গাড়ির চাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফুটো করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখত। তবে সেই উদ্যোগও স্থায়ীভাবে কার্যকর হয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে অবৈধ রিকশার প্রবেশ ঠেকাতে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ একে একে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বশেষ ট্র্যাপার ব্যবস্থাও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকেনি। ফলে যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়ক শৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনা ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্য পূরণে প্রশাসন নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এ বিষয়ে Dhaka Metropolitan Police-এর অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, সড়কে রিকশা চলাচল সীমিত করার অংশ হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি স্থানে ট্র্যাপার বসানো হয়েছিল। কিন্তু রিকশাচালকেরা লক্ষ্য করে সেগুলো নষ্ট করে ফেলেন। কোথাও পিটিয়ে সমান করা হয়েছে, কোথাও সিমেন্ট ঢেলে বন্ধ করা হয়েছে, আবার কোথাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো থেকে অবৈধ রিকশা সরাতে প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং তা আরও জোরদার করা হবে। নতুন সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী যেকোনো মূল্যে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু যান্ত্রিক ফাঁদ বসিয়ে নয়, বরং সমন্বিত পরিকল্পনা, বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা, কার্যকর নজরদারি এবং ধারাবাহিক তদারকি ছাড়া এ ধরনের উদ্যোগ টেকসই হয় না। অন্যথায়, ট্র্যাপার বসালেও শেষ পর্যন্ত তা পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
reporter



