ছবি: ফাইল ছবি
অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বড় আকারের প্রকল্প গ্রহণ, অতিমূল্যায়ন, অস্বচ্ছ চুক্তি ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ঋণঝুঁকির ফাঁদের দিকে এগোচ্ছে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন গবেষকরা। রাজধানীতে আয়োজিত ‘সরকারি ঋণ ও সুশাসন’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত গবেষণায় বলা হয়, ঋণ নেওয়া নিজেই সমস্যা নয়; বরং সমস্যা হলো ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং তা কতটা কার্যকরভাবে অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছে University of London–এর অধীন একটি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সহযোগিতায় একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা ও দেশের গবেষণা সংগঠন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ। এতে ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিবহন, বিদ্যুৎ, বন্দর, বিমান চলাচল ও শিল্পাঞ্চলসহ ৪২টি বড় প্রকল্প বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৫ সালে বেড়ে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে—অর্থাৎ ১৬ বছরে বৃদ্ধি প্রায় ৩৭৭ শতাংশ। একই সময়ে সুদ পরিশোধের চাপও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বর্তমানে সরকারি আয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কেবল সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে, ফলে উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
৪২টি প্রকল্পের মধ্যে ২৯টিতে গড়ে ৭০.৩ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে মোট ব্যয়ের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দুর্নীতি, অদক্ষতা বা যোগসাজশের কারণে অপচয় হয়েছে বলে গবেষণায় দাবি করা হয়। আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুশতাক এইচ খান বলেন, চুক্তির দামে সামান্য অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণও দীর্ঘমেয়াদে বিপুল আর্থিক দায়ে রূপ নেয়। প্রতিযোগিতাহীন দরপত্র, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল জবাবদিহি কাঠামো এই ঝুঁকি বাড়ায়।
গবেষণায় অবকাঠামো প্রকল্পে দুই ধরনের বড় ব্যর্থতার কথা তুলে ধরা হয়। প্রথমত, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও তার ব্যয় এত বেশি নির্ধারণ করা হয় যে প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ সম্ভব হয় না। দ্বিতীয়ত, দুর্বল পরিকল্পনা, ত্রুটিপূর্ণ নকশা ও অপর্যাপ্ত প্রস্তুতির কারণে অনেক প্রকল্প কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে আয় কম হলেও ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়, যা অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ায়।
বিদ্যুৎ খাতকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৫ সালে স্থির সক্ষমতা চার্জ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, সরকারকে নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির কারণে বছরে প্রায় ৪.৯ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ভর্তুকি তুলে নিলে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উৎপাদকদের পরিশোধ ১১ গুণ এবং সক্ষমতা চার্জ ২০ গুণ বেড়েছে, অথচ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার গুণ। এ বিষয়ে Bangladesh Power Development Board–এর একজন পরিচালক জানান, বিশেষ আইন বাতিল ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র চালুর ফলে সৌরবিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে।
আলোচনায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়। ২০২২ সালে Sri Lanka–এর আর্থিক সংকটের উদাহরণ উল্লেখ করে বলা হয়, দেশটির প্রায় ৬৫ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ অবকাঠামো খাতে ব্যয় হলেও অনেক প্রকল্প প্রত্যাশিত আয় দিতে পারেনি। সাবেক প্রেসিডেন্ট Mahinda Rajapaksa–র সময় নেওয়া একাধিক প্রকল্প পরে অকার্যকর হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত আয় না থাকায় ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়তে বাড়তে দেশটি গভীর সংকটে পড়ে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, সংশোধিত হিসাবে বাংলাদেশের প্রকৃত ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখন প্রায় ৪২ শতাংশ, যা পূর্বে নিরাপদ ধরা ৩৩ শতাংশের চেয়ে বেশি। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
আলোচনায় United Nations Development Programme–এর কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার বলেন, ঋণ গ্রহণকে অবশ্যই নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে, যাতে তা টেকসই উন্নয়নে রূপ নেয়। International Monetary Fund–এর সুশাসন ডায়াগনস্টিকস ও দাতাদের কারিগরি সহায়তা ব্যবহার করে ক্রয়প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার আহ্বান জানান Foreign, Commonwealth & Development Office–এর গভর্ন্যান্স অ্যাডভাইজার।
গবেষণার সারকথা—স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, প্রকল্প শুরুর আগে পূর্ণ প্রস্তুতি, কর্মসম্পাদনের সঙ্গে অর্থ ছাড় এবং জবাবদিহিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া ঋণনির্ভর উন্নয়ন টেকসই হবে না। অন্যথায়, উচ্চ ঋণ, ভর্তুকি ও অদক্ষ বিনিয়োগের চাপ অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে গভীর ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
reporter


