ছবি: ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান–এর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা তীব্র আকার ধারণ করেছে। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও সামরিক সূত্রগুলো বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার জন্য মার্কিন বাহিনী প্রায় পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এখন শুধু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষা।
খবরে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে মার্কিন বিমান ও নৌশক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করা হয়েছে। অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান মোতায়েনের পাশাপাশি আকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য উন্নত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। আরব সাগরে বিমানবাহী রণতরির উপস্থিতিও বাড়ানো হয়েছে, যা সম্ভাব্য হামলার সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের প্রস্তুতি সাধারণ চাপ সৃষ্টির কৌশলের চেয়ে বড় ধরনের অভিযানের ইঙ্গিত দেয়।
একই সঙ্গে সম্ভাব্য পাল্টা আঘাতের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন অঞ্চলটিতে অবস্থানরত কিছু অপ্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সরিয়ে নিচ্ছে। এতে বোঝা যায়, পরিস্থিতি যে কোনো সময় উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে ওয়াশিংটনের আশঙ্কা রয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি, তথাপি সামরিক প্রস্তুতির মাত্রা পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করছে।
অন্যদিকে ইরানও নীরব নেই। তারা রাশিয়ার সঙ্গে ওমান সাগরে যৌথ সামরিক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে। তেহরান ইতোমধ্যে জাতিসংঘ–এ পাঠানো বার্তায় সতর্ক করেছে—যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হুমকি বাস্তবায়ন করলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থ ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ইরানি কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন আগ্রাসন শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাই নয়, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করবে।
এদিকে যুক্তরাজ্য স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালানোর অনুমতি দেওয়া হবে না। ব্রিটিশ নেতৃত্বের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে এবং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। এ সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটন অসন্তুষ্ট হলেও লন্ডন তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।
অঞ্চলীয় ভূরাজনীতিতেও নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত–এর কিছু নীতিনির্ধারক ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘লক্ষ্যভিত্তিক’ সামরিক পদক্ষেপে সমর্থন জানাতে পারেন বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ যে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী হতে পারে এবং তাতে আরও দেশ জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে—এ আশঙ্কাও জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।
ইরান প্রসঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলেও জানা যায়। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ নিজেদের ‘মূল অবস্থান’ থেকে সরে আসতে তেহরান অনাগ্রহী। অনেক বিশ্লেষকের মতে, সামরিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে আলোচনায় বড় ধরনের ছাড় আদায়ের কৌশল গ্রহণ করেছে ওয়াশিংটন। তবে পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে তা আঞ্চলিক সীমা অতিক্রম করে বহুমুখী সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
রাশিয়া ইতোমধ্যে ইরানের প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে, যা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্য আবারও বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সামান্য ভুল হিসাব বা ভুল বোঝাবুঝিও বড় আকারের সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে কূটনীতিকরা সতর্ক করছেন।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অস্থির। সামরিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন, পাল্টা হুঁশিয়ারিও স্পষ্ট—এখন নজর সবার সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে। ট্রাম্প প্রশাসন যদি হামলার নির্দেশ দেয়, তাহলে তা শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
reporter


