ছবি: ফাইল ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পর দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, আর এই নির্বাচন ঘিরেই দায়িত্ব গ্রহণের অপেক্ষায় থাকা নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা। নির্বাচিত সরকার ও অপেক্ষমাণ তরুণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর প্রতি মানুষের প্রত্যাশা যেমন আকাশছোঁয়া, তেমনি অর্থনীতির বাস্তব চিত্রও অত্যন্ত কঠিন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বাজেট ঘাটতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট—সব মিলিয়ে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতেই সংকট স্পষ্ট। ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও খেলাপি ঋণের বোঝা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নির্বাচনি ইশতেহারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হতে যাচ্ছে পবিত্র রমজান মাস, ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা নতুন সরকারের জন্য একটি তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, এই মুহূর্তে অর্থনৈতিক সংস্কার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য। নতুন সরকার ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে, কিন্তু এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে। কয়েক মাস পরই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা, যা দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন চাপ তৈরি করবে। যদিও ব্যবসায়ীরা সময়সীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেই দাবির খুব একটা প্রতিফলন ঘটেনি। অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতির পতনের ধারা কিছুটা থামিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সহনীয় পর্যায়ে আনতে সক্ষম হলেও বিনিয়োগ স্থবিরতা ও কর্মসংস্থানের সংকট কাটাতে পারেনি। জুলাই আন্দোলনের প্রভাব রপ্তানিমুখী শিল্পে বড় ধাক্কা দিয়েছে, যার ফলে রপ্তানি আয়ের প্রবণতা এখনো নেতিবাচক। রাজস্ব আহরণেও তৈরি হয়েছে বড় ঘাটতি, যা বছর শেষে বাজেট ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা ডিসেম্বরে কমে ৬ দশমিক ১০ শতাংশে নেমে আসে—গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। মূল্যস্ফীতি এখনো দুই অঙ্কের কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো–এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে, যেখানে ২০২২ সালে তা ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একইভাবে চরম দারিদ্র্যের হারও বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাংক–এর সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, মানুষ এখন কঠিন সময় পার করছে, তাই আর্থিক সচ্ছলতা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। ব্যাংক খাত দীর্ঘদিনের অনিয়মে প্রায় ধ্বংসের মুখে পৌঁছেছে এবং বিতরণ করা ঋণের বড় অংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। কিছু ব্যাংক একীভূত করা হলেও খাতটি সুসংহত করতে আরও বড় সংস্কার প্রয়োজন। অর্থ পাচার রোধে কিছু অগ্রগতি হলেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য কমাতে এবং অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হলে কর্মসংস্থান বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই, আর কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করা জরুরি। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের জন্য অর্থনীতি পুনরুদ্ধারই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, যার সফলতা নির্ভর করবে দ্রুত সিদ্ধান্ত, কার্যকর সংস্কার এবং রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর।
reporter