ছবি: সংগৃহীত ছবি
বিশ্বজুড়ে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা যে আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে, তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক ভূরাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। ইরান থেকে শুরু করে ইরাক, লিবিয়া কিংবা আজকের ভেনেজুয়েলা—প্রতিটি দেশেই তেলের মতো মূল্যবান সম্পদের কারণে সংঘর্ষ, নিষেধাজ্ঞা, অভ্যুত্থান কিংবা সামরিক অভিযানের মতো ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে বহু রাষ্ট্রের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে এবং রাজনৈতিক স্থিতি দুর্বল হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন বিশ্ববাজারে তেলের গুরুত্ব দ্রুত বেড়ে যায়, তখনই ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার বদলে যায় এবং মূল উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে খনিজ সম্পদের ওপর আধিপত্য বজায় রাখা। ১৯৫০-এর দশকে ইরানের তেল জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাকে অপারেশন আজাক্সের মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্ররোচিত করে, যা শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাত এবং শাহ রেজা পেহলভির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। পরবর্তী সময়ে ইরাকের তেলকে ডলার থেকে ইউরোতে বদলানোর ঘোষণা সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে ২০০৩ সালের যুদ্ধের অনুঘটক হয়ে দাঁড়ায়, যদিও গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অভিযোগ যুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবে কোনোদিনই প্রমাণিত হয়নি। লিবিয়ায় মুয়ম্মর গদ্দাফির পতনের পেছনেও ছিল আফ্রিকান গোল্ড দিনার ও তেলের বিনিময়ে ডলারের প্রচলন ভাঙার প্রচেষ্টা, যা আন্তর্জাতিক বাজারে উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং গৃহযুদ্ধের বিশৃঙ্খলা দীর্ঘায়িত করে। বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু উচ্চমানের তেলের ভাণ্ডার এবং তার বাণিজ্যিক লাভ, যা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে কূটনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে তেলের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যবস্থায় এমন এক জটিলতা তৈরি হয়েছে যেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা উন্নয়নমূলক আলোচনার চেয়ে ভূরাজনৈতিক স্বার্থই অগ্রাধিকার পেয়েছে এবং এর ফল ভোগ করেছে সংশ্লিষ্ট দেশের সাধারণ মানুষ, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা।
repoter

