ছবি: ফাইল ছবি
দীর্ঘ অপেক্ষা ও সংগ্রামের পর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। স্বতঃস্ফূর্ত ভোটার উপস্থিতি, তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ এই নির্বাচনকে গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো—যে নেত্রী আজীবন গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকারের প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন, সেই বেগম খালেদা জিয়া এই বিজয়ের দৃশ্য দেখে যেতে পারলেন না।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া ছিলেন সংগ্রাম, ধৈর্য ও দৃঢ়তার প্রতিচ্ছবি। তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন ঘটনাচক্রে, একজন সাধারণ গৃহবধূ হিসেবে। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি দায়িত্ব নেন দলের নেতৃত্বে, পরবর্তীতে দেশের শাসনভারও সামলান। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা তাঁকে এনে দেয় ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধা, যা তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহন করে গেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন শুধু একটি সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়; এটি দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, ভোটাধিকার সংকট ও গণতান্ত্রিক শূন্যতার এক প্রতীকী অবসান। ভোটের দিন দেশজুড়ে যে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা গেছে, তাতে স্পষ্ট—মানুষ তাদের হারানো অধিকার ফিরে পাওয়ার আনন্দে শামিল হয়েছে। এই মুহূর্তে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি তাই আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়েছে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে।
দলের নেতারা আক্ষেপ করে বলেছেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যিনি দেশের মানুষ ও গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেছেন, যিনি কখনো আপস করেননি, সেই নেত্রী এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হতে পারলেন না। বেঁচে থাকলে তিনিই হয়তো এই বিজয়ে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হতেন। কারণ, এই অর্জন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়েরই পরিণতি বলে মনে করেন অনেকেই।
নির্বাচনের বেসরকারি ফল অনুযায়ী, বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান একাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছেন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁকেই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটানো তারেক রহমানের এই সাফল্যও খালেদা জিয়া দেখে যেতে পারেননি—এটি দলের জন্য আরেকটি গভীর বেদনার কারণ।
খালেদা জিয়াকে নেতাকর্মীরা সবসময় ‘দেশনেত্রী’ বলে সম্বোধন করতেন। সময়ের প্রবাহে তিনি কেবল একটি দলের নেত্রী নন, বরং অনেকের কাছে হয়ে উঠেছিলেন জাতির অভিভাবকসুলভ এক ব্যক্তিত্ব। ভদ্রতা, আত্মমর্যাদা ও দৃঢ়চেতা মনোবল ছিল তাঁর রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। কঠিন সময়, বন্দিত্ব, অপমান ও ব্যক্তিগত শোক—সবকিছুই তিনি বহন করেছেন নীরব শক্তিতে।
২০০৭ সালের সংকটকালে তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টার মুখেও তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, বাংলাদেশই তাঁর একমাত্র ঠিকানা। এই দেশ, এই মাটি ও এই মানুষই ছিল তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক বেদনাদায়ক ক্ষতির মধ্যেও তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াননি।
আজ গণতন্ত্রের বিজয়ের প্রাক্কালে তাই খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছেন এক অনুপস্থিত উপস্থিতি। তাঁর অবদান, ত্যাগ ও আপসহীন অবস্থান এই বিজয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। নির্বাচন শেষ হলেও মানুষের স্মৃতিতে ও রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি থাকবেন সেই নেত্রী হিসেবে—যিনি গণতন্ত্রের জন্য সবকিছু সহ্য করেছেন, কিন্তু সেই বিজয়ের দৃশ্য নিজ চোখে দেখে যেতে পারেননি।
reporter



